মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

জেলার ঐতিহ্য

নড়াইল একটি প্রাচীন জনপদ। কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই জেলা আপন মহিমায় ভাস্বর, অবারিত মাঠ, শ্যামল প্রান্তর , ইছামতি, চাচুড়ী সহ অসংখ্য বিলের স‘ফটিক স্বচ্ছ কালোজল, জলধারা , মধুমতি, চিত্রা, নবগঙ্গা আর কাজলা নদীর প্রবাহমানতা এই জেলাকে  দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। নড়াইলের লোকজ ঐতিহ্যের  মধ্যে  যাত্রাগান, পালাগান,নৌকাবাইচ, হাডুডু খেলা, লাঠি খেলা, হালুইগান, ষাড়ের লড়াই , বিভিন্ন মেলা, পিঠাগুলি, কবিগান, জারিগান, গাজিরগান, বৃষ্টির গান ইত্যাদি সবিশেষ  উল্লেখযোগ্য ।

 

নড়াইলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য 

 

বর্তমানে নড়াইল একটি জেলা শহর। ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ মাসে তৎকালীন মহকুমা হতে জেলা হিসেবে  মর্যাদা লাভ করে। এই জেলার উত্তরে মাগুরা জেলার শালিখা ও মহম্মদপুর থানা, দক্ষিণে খুলনা জেলার তেরখাদা, দীঘলিয়া ও মোল্লার হাট, পূর্বে ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ এবং পশ্চিমে যশোর জেলার অভয়নগর, বাঘারপাড়া ও কোতয়ালী থানা অবস্থিত। নড়াইল জেলার আয়তন ৯৭৬ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ৬৫৯৬৮১ এর মধ্যে ৩৩৩৮১৬ জন পুরুষ ও ৩২৫৮৬৫ জন মহিলা। নড়াইলকে মোটামুটি নদী সমৃদ্ধ অঞ্চল বলা যায়। এই জেলার উপর দিয়ে মধুমতি, চিত্রা, কাজলা, নলিয়া, নড়াগাতি, নবগঙ্গা, কালিগঙ্গা ও আঠারবাঁকি ছাড়াও শিরোমনি শাখার গাল ও হ্যালিক্যাকস ক্যানেল প্রবাহিত ছিল। তন্মধ্যে ৩/৪ টি নদী মৃত বলা চলে, অপর ৮/৭টি নদী এখন প্রবাহমান।
ভূতাত্বিকদের মতানুসারে আনুমানিক দশ লক্ষ বৎসর পূর্বে গঙ্গা নদীর পলিমাটি দ্বারা যে গঙ্গেয় ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছিলো’ সেই দ্বীপসমূহের অন্তর্গত এক ভূখন্ডই হল বর্তমান নড়াইল জেলা। তৎকালে নড়াইল জেলা সাগর তীরবর্তী বর্তমান সুন্দরবনের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ষাট, সত্তর বৎসর পূর্বেও এই জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পুকুর বা কুয়া খনন করে হরিণ, বাঘ ও অন্যান্য জীবজন্তুর ফসিল পাওয়া যেত এবং তা থেকে প্রমাণিত যে নদীমাতৃক এই জেলার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমি বিস্তৃত ছিলো।
ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায় যে গুপ্ত যুগে নড়াইল অঞ্চলের পূর্ব সীমান্ত মধুমতি নদী পর্যন্ত, সমগ্র যশোর সহ গুপ্ত সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং ইহা ৩৪০ হতে ৩৭৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। রাজা শাশাঙ্ক ৬০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন এবং তার রাজধানী ছিল কর্ণ সুবর্ণ নগর মতান্তরে লক্ষণাবর্তী। অতঃপর সম্রাট হর্ষ বর্ধন শশাঙ্ককে পরাজিত করে এই অঞ্চলকে তারা করায়ত্ত করেন। অতএব বলা যায় যে বৃহত্তর যশোরসহ নড়াইল জেলা শশাঙ্গ ও হর্যবর্ধন রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। আনুমানিক দেড়শত বৎসর নড়াইল জেলা অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল বাহুবলে শাসিত হয়েছিল বলে জানা যায়। শুধু এই অঞ্চলই নয় সমগ্র বাংলাদেশই এরূপ দু’জন রাজা ছিলেন নয়াবাড়ীর পাতালভেদী রাজা এবং উজিরপুর কশিয়াড়ার রাজা।
পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে পাল বংশ দ্বারা শসিত হয়। পাল বংশের পতনের কর্ণাটক হতে আগত সেন রাজাদের রাজত্য কায়েম হয়। ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে তুর্কি সেনা নায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলাদেশ অধিকারের ফলে রাজা লক্ষণ সোনের রাজত্বকাল সমাপ্তি ঘটতে থাকে। এরপর আসে মুসলিম শাসনামল। তখন, বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় পর্যায়ক্রমে ৩৭ বৎসর পাঠান আমল এবং অতঃপর প্রায় দুইশত বৎসর সুলতানী আমল বিরাজমান ছিল। ইংরেজ আমলে ১৭৮৬ সালে যাশোর একটি জেলা রূপে প্রকাশ পায়। তখন নড়াইলের পূর্বাঞ্চল ব্যতীত সমগ্র বৃহত্তর যশোর সহ বৃহত্তর খুলনা জেলা যশোরের অন্তর্গত ছিল। ১৯৯৩ সালে নলদী পরগণা সহ ভূষণা ফরিদপুর জেলার পশ্চিমাঞ্চল যশোরের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৮৪২ সালে খুলনাকে পৃথক মহকুমায় পরিণত করে নড়াইলের কালিয়া থানার দক্ষিণাঞ্চল তার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৮৬১ সালে নীল বিদ্রোহের সময় নড়াইল একটি পৃথক মহকুমা স্থাপিত হয়। মহকুমা সদরের স্থান নির্বাচনের জন্য মহিষখোলা মৌজার নড়াইল মহকুমার সদরকেই বেছে নেয়া হয়। প্রকৃত নড়াইল মৌজা শহর হতে ৩ কিলোমিটার দূরে যেখানে নড়াইলের জমিদারদের প্রসাদ অবস্থিত ছিলো এবং অপরদিকে মহকুমা প্রশাসকের বাসভবনই নীলকরদের কুঠিবাড়ী ছিল।
১৯০১ সালের শুমারী অনুযায়ী নড়াইল মহকুমা-নড়াইল, বড় কালিয়া, লোহাগড়া থানা  গঠিত যার লোক সংখ্যা ছিলো ৩৫২২৮৯ জন। ১৯৩৯ সালের তথ্যে জানা যায় যে, সাবেক যশোরের পাঁচটি মহকুমার পূবাঞ্চলের একটি সমৃদ্ধশালী মহকুমা ছিল নড়াইল। ১৯৩৫ সালে সীমানা পূর্ণগঠনের প্রেক্ষিতে বিদালী, পোড়ালী ও শেখহাটি ইউনিয়নকে নড়াইল থানার সাথে এবং পোড়লী ইউনিয়নকে কালিয়া থানার সাথে সংযুক্ত করা হয়।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর লোহাগড়া, কালিয়া, আলফাডাঙ্গা ও নড়াইল এই চারটি থানা  নাড়াইল মহকুমা অবশিষ্ট থাকে। ১৯৬০ সালে আবার আলফাডাঙ্গা নাড়াইল হতে বিছিন্ন করে ফরিদপুরের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এইভাবে বিভিন্ন সময় নড়াইলের ভৌগোলিক সীমারেখা সংকুচিত করা হয়েছে।
বর্তমানে ৪টি থানা নিয়ে নড়াইল জেলা গঠিত-
লোহাগড়া, কালিয়া, নড়াগাতি ও নড়াইল সদর।
১৯৪৮ সালে ১লা মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে নড়াইলকে জেলা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হলেও অনেক সংগ্রাম, হরতাল, সমাবেশ ও অনশন ধর্মঘটের ফলশ্রুতিতে ১৯৮৪ সালের ১লা জুলাই নাড়াইলকে পূণাঙ্গ জেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নড়াইল জেলার বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী। যেমন জেলার শিক্ষিতের হার ২৯% যেখানে দেশের শিক্ষিতের হার ২৪%। ১টি সরকারী ও ১টি মাহিলা কলেজ সহ মোট ৬টি কলেজ বিদ্যমান। ৭৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২টি সরকারী, ৯টি বালিকা ও জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭টি। এছাড়াও ১টি মহিলা মাদ্রাসা ও ১টি কামিল মাদ্রাসা রয়েছে। ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রায় দেড় ডজন স্থাপনা। তন্মধ্যে, রায়ত্তামের জোড়া বাংলা, নলদী গাজীর দরগাহ, পাতালবেদী রাজার বাড়ী লোহাগড়া প্রাচীন জোড় বাংলা, রাজা কেশব রয়ের বাড়ী, লক্ষ্মীপাশা কালীবাড়ী অন্যতম।
এইসঙ্গে ছিলো নড়াইলের কিংবদন্তীসম ফকির দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকদের নাম উল্লেখযোগ্য যোমন- ফকির ওসমান, সাধক লেংটা শাহ, বুড়ো দেওয়ান, গঙ্গাধর পাগল অন্যতম। নড়াইলের বিভিন্নস্থনে চারজন জমিদার ছিল, যেমন নড়াইলের জমিদার হাটবাড়ীয়ার জমিদার কালাড়া ও নলদীর জমিদার, এছাড়াও এদের অধীন ৭ জন তালুকদার বা ছোট জমিদার দিন। নীলচাষ আমলে সমস্ত নড়াইলে প্রায় ২০টির মত নীল সাহেবদের কুঠিবাড়ী ছিল। সমস্ত জেলার প্রায় দেড়শত গ্রাম ও জনপদ নিয়ে গঠিত।
নড়াইল জেলায় রয়েছে প্রায় দুইশত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, বিশেষ খ্যাতি সম্পন্ন ৭জনের  নাম অন্তর্জাতিকভাবে  যেমন - সৈয়দ নওশের আলী- ফজলুল হক মন্ত্রী সভার মন্ত্রী, এস এম সুলতান- আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তীসম শিল্পী, উদয় শঙ্কর- ভূবনখ্যাত শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী, পন্ডিত রবিশঙ্কর- আন্তজর্তিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতার শিল্পী, চারণ কবি মোসলেমউদ্দিন - ১৩০০ সালের রচয়িতা, কবিয়াল বিজয় সরকার - শ্রেষ্ঠ কবি গায়ক, ডাঃ নিহার রঞ্জন গুপ্ত- প্রায় ৫০টি উপন্যাসের লেখক, নূর জালাল - তেভাগা আন্দোলনোর মধ্যমনি, কমলদাশগুপ্ত - নজরুল সঙ্গীততের নির্ধারিত সুরকার ও অমলকৃষ্ণ সোম প্রাখ্যাত মঞ্চাভিনেতা ১০০ টির মতো মঞ্চ নাটক করেছেন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মুহাম্মদ - ১৯৭১ এর সম্মুখসমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

 

নড়াইলের যাত্রাগান

১৮ শতকের শেষাংশ হতে উনিশ শতকের মাধ্য সময় পর্যন্ত গীত প্রধান পদ্যছন্দে ধর্মীয় কিংবা সমাজ ভিত্তিক কাহিনীগুলিকে রুপকল্পের মাধ্যমে চরিত্রে চিত্রিত করে তার মঞ্চে কিংবা খোলা আসরে অভিনীত হত মুলতঃ তাইই যাত্রা গান  এর পরে অবশ্য ইংরেজী থিয়েটারের প্রভাবে যাত্রার মুল চেহারা বদলাতে থাকে। যাহোক সে সময়ে নড়াইলের জমিদার বাড়ী কেন্দ্রীক সংস্কৃতি জাকজমকের সংগে সম্পন্ন হত এবং এর প্রভাবে উৎসাহিত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় যাত্রাসহ সাংস্কৃতিক অন্যান্য বিষয় ও বিখ্যাত গায়ক, অভিনেতা, অভিনেত্রী সুরশিল্পীসহ যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষের আবির্ভাব নড়াইলে দেখা যায়।

 

জমিদার ভ্রাতা বাবু মহীন্দ্র রায় সর্বপ্রথম নড়াইলে যাত্রাদল গঠন করেন এবং বিখ্যাত অভিনেতা শেলকম সাহেব তার দলভূক্ত ছিলেন। এরপর অত্র জেলায় নিম্নবর্ণিত যাত্রাদল গঠিত হয় এবং দলগুলো অতি সুনামের সাথে পরিচালিত হতে থাকে।

 

০১।     মুকুল অপেরা, মহিষখোলা, নড়াইল ।

০২।     মহামায়া যাত্রা নলদীরচর গোবরা, নড়াইল।

০৩।     স্মৃতি দুর্গা অপেরা গোবরা নড়াইল।

০৪।     মালিয়াট যাত্রা পার্টি, মালিয়ার্ট নড়াইল ।

০৫।     দিপালী অপেরা, কালিয়া, নড়াইল।

০৬।     রংমহল অপেরা, কালিয়া, নড়াইল ।

০৭।     সত্যস্বর অপেরা, সিংগাশোলপুর, নড়াইল  ইত্যাদি যাত্রাদল ও খ্যাতিমান শিল্পী কুশলী  সম্পর্কে জানা যায়।

 

 নড়াইলের পালা গান

পালাগান প্রাচীন কাল হতে বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও সাধারণ মানুষের কাছে এক চির পরিচিত পছন্দের সংগীত। যা মানুষকে শুধু আনন্দই দেয়না বরং প্রচন্ড আলোড়নে অন্দোলিত করে। নড়াইলের পালা গান বলতে জারী গান এবং কবি গানকে বোঝায়। এই দুধরনের গানই ধর্ম, দর্শন বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়বস্তু সন্নিবেশিত করে। একজন মুল গায়ক ও ৫/৬ জন দোহারসহ গীত হয়। একজন প্রশ্ন করেন এবং অপর জন জবাব দেন ও পাল্টা প্রশ্ন করেন। সাধারণত সারা রাত এভাবে  আসর চলে। বিজয় সরকার ও মোসলেম বয়াতীর জন্য নড়াইলের কবি ও জারী গান শ্রেষ্ঠ হয়ে আছে।

         

নৌকা বাইচ

নড়াইলের চিত্রা, নবগঙ্গা, মধুমতী কাজলা নদীতে বর্ষাকালে নৌকা বাইচ হয়ে থাকে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য  নৌকা বাইচ হল এস,এম সুলতানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ১০ই আগস্ট অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ। প্রতি বছর ১০ আগস্ট এই  বাইচ হয়ে থাকে। পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জ, মাগুরা, খুলনা জেলা থেকে অনেক বাইচের নৌকা এই প্রতিযোগিতায়  অংশ নেয়। বাইচের নৌকাকে সহানীয়  ভাষায়  বলে বাছাড়ী নৌকা। দীর্ঘ  সরু  অপরুপ সাজে সজ্জিত বাইচের নৌকাগুলি দেখতে বড়ই নান্দনিক ।

 

হাডুডু খেলা

হাডুডু এ জেলার  প্রাচীনও জনপ্রিয় খেলা। সাধারনতঃ আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র আশ্বিন এই  চার মাস এই খেলা হয়ে  থাকে। হাডুডু খেলার জন্য বড় মাঠের প্রয়োজন হয় না। প্রতিপক্ষে সাত জন করে খেলোয়াড়  থাকে। সাধারণতঃ বিকালে হাডুডু খেলা হয়। সহানীয় ভাষায়  হাডুডু খেলাকে  ডুগডুগে বা চোল কুত কুত খেলা বলা হয়। নওশের , সালাম, আবু তালেব, বুলু নড়াইল জেলার এক সময়কার নড়াইল জেলার উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় ইদানিং এই খেলাকে  কাবাডি খেলা  নামে  অভিহিত  করা হয় ।

 

লাঠিখেলা

 

লাঠি খেলা নড়াইল জেলার একটি  প্রাচীনতম খেলা, হিন্দু মুসলমান  উভয়  সম্প্রদায়ের শুধু  পুরুষরাই  এই খেলায় অনুশীলন করে। বিভিন্ন উৎসব  অনুষ্ঠান বা পার্বন উপলক্ষ্যে সাধারণতঃ  এ  লাঠি খেলার  প্রতিযোগিতা  হয়ে  থাকে। নড়াইল জেলার  সিঙ্গা- হাড়িগড়া, বাহিরগ্রাম, শিমুলিয়া, বিছালী, গোবরা, চারিখাদা, মালাধরা  , আগদিয়া , লাহুড়িয়া, কুমড়ি, ডিক্রিরচর, পাংখারচর  প্রভৃতিসহানে লাঠিখেলা  অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ।

 

হালুই গান

নড়াইল জেলায়  হালুই  একটি জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান । পৌষ মাসের শেষ ৭দিন রাতের বেলা ৭/৮ জনের  একটি  দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে হালুই গান গেয়ে  ধান এবং  চাউল উঠায় । অনেকে টাকা পয়সাও দান করে । এই  গানের  মূল  বিষয়  বস্তু হল  বাস্তুর নামে দান করিলে বাস্তু ঠান্ডা হয় । ৭ দিন ধরে ধান চাল তুলে পৌষ মাসের শেষ  দিন পৌষ সংক্রান্তিতে  শিরনা  রান্না করে  বিতরণ  করা হয় । এতে বাড়ীর কল্যাণ হয়  মর্মে  বিশ্বাস  করা হয় ।

 

ষাড়ের লড়াই

 

নড়াইল জেলার প্রত্যন্ত  পল্লী অঞ্চলে একটি উপভোগ্য ক্রীড়া হল ষাড়ের লড়াই। লাল, কালো ধারালো শিং ওয়ালা, মালা পরিহিত চুট ওয়ালা ষাড় গুলি  লড়াই  এর জন্য যখন প্রস্তুত  হয়। তখন অপেক্ষমান হাজার হাজার দর্শক করতালি ও উল্লাসধ্বনি দেয়। প্রতিটি  ষাড়ের  সাথে ২ জন ওস্তাদ থেকে  দুটি  ষাড়কে  লড়াইয়ের  মুখোমুখী  করিয়ে দেন। বিভিন্ন  মন্ত্র ও যাদু টোনা  করা হয় বলে লোকমুখে  প্রচলিত আছে। বাঁশগ্রামের  ষাড়ের  লড়াই  এই  অঞ্চলে অত্যন্ত বিখ্যাত / বিজয়ী ষাড়ের মালিকদের  পুরস্কৃত করা হয় ।

 

নড়াইলের মেলা

মেলা একদিকে মানুষের প্রাণ বিনিময়ের স্থান এবং অন্যদিকে একশ্রেণীর মানুষের অর্থনৈতিক সঞ্চয়ের মাধ্যম নড়াইল জেলার মেলাগুলোর মাঝে সদর উপজেলায় নিশিনাথতলার মেলা, হিজলডাংগার মেলা, বেতেঙ্গার চড়ক মেলা, মোসলেম মোলা, সুলতান মেলা, টেংরাখালীর মেলা, হোগলাডাংগার মেলা, বিজয় মেলা, আফরার মেলা, বুড়িশাল মেলা (শেখহাটি), চাকই মেলা বিলডুমুর তলা মেলা, মুলিয়ার মেলা, হাতিয়াড়ার মেলা, জুড়ালিয়ার মেলা, রুপগজ্ঞ রথের মেলা সিংগাশোলপুর রথের মেলা নুর মোহাম্মদ মেলা, থিয়েডাংগা ফেলো গুসাই এর মেলা, দেবভোগ রাম মেলা রুখালী কবি গানের মেলা, বোড়ামারা কাজী বাড়ী মেলা কালিয়া উপজেলার কালিয়া ভামিনীসেনের বাড়ির রথের মেলা, চাঁচুড়ী পুরুলিয়া শ্মশানের মেলা, বেন্দার নিশি ঠাকুরের মেলা, দেবদুনের পাগল ঠাকুরের মেলা, টুনার ঈদের মেলা, গরীবপুরের দোল মেলা, কলাবাড়িযা শীতল পুজার মেলা, বল্লারহাটি পাচুশাহ-র মেলা, হাড়িয়াঘোপ মুক্তার ফকিরের মেলা, পেড়লী উরসের মেলা, বাঐসোনা কুড়ন ফকিরের মেলা, চোরখালী আফরার মেলা, পনিপাড়া লেংটা সাহার মেলা, কালীনগর পিয়েলের গুসাইর মেলা ইত্যাদি। লোহাগড়া উপজেলার রামপুরা ফজুশাহর মেলা, কাশিপুরের নিশি বটের মেলা, কুমড়ী দোল পুজার মেলা, টিকের ডাংগা চৈতালী মেলা, জয়পুর তারক গোসাইর মেলা , সিদ্দেশ্বরী কালী পুজার মেলা ব্রক্ষ্মণডাংগা বৈশাখী মেলা, লোহাগড়া কলেজের রথের মেলা, তেলকাড়া ঈদের মেলা, করফার মেলা, ইতনার মেলা, বয়রার খাজা বারার মেলা, কাষ্ণনপুরের শ্মশানের মেলা , মহাজন লক্ষীপুজার মেলা, সরশুনার পীর ভিটের মেলা, শিয়রবরের দুর্গাপুজার মেলা, নোয়াগ্রাম সৈয়দ বাড়ির উরস এর মেলা ।

 

নড়াইলের পার্ক ও সিনেমা হল

নিরিবিলি পিকনিক স্পষ্ট, রামপুরা লোহাগড়া , চিত্রা রিসোর্ট,বোড়াবাদুরিয়া, নড়াইল, অরুনিমা ইকোপার্ক পানিপাড়া  কালিয়া ।

 

নড়াইলের নৌকা

 

নড়াইল অঞ্চলে একসময় ডিঙ্গি নৌকা, টাবুরে নৌকা ও ডোঙ্গা বা তালের নৌকা ছিল যাতায়াতের অন্যতম বাহন। এখন আর টাবুরে নৌকা দেখা যায় না। সব এলাকায় ডোঙ্গাও আর তেমন চলে না। বলতে গেলে হারিয়ে যেতে বসেছে এই নৌকা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাটির কয়েকটি এলাকার কারিগররা টিকিয়ে রেখেছেন এই লোক ঐতিহ্য।

সদর উপজেলার চর শালিখা ও রামসিদ্ধি গ্রামের কারিগরদের কল্যাণে তালগাছ দিয়ে ডোঙ্গা বানানোর এই শিল্প টিকে আছে। তাঁদের হাতে তৈরি হয় নানা নকশার ডোঙ্গা। এই অঞ্চলে তালগাছের আধিক্যই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তাঁরা। এখন অবশ্য গাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা তেমন ভালো নয় বলে জানালেন কারিগররা। তাঁরা জানান, সদর উপজেলার তুলারামপুর হাট, মাইজপাড়া হাট ও কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি-পেড়লি হাটে ডোঙ্গার হাট বসে। এর মধ্যে তুলারামপুর হাটে বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি ডোঙ্গা। শুধু এই হাটেই ছয় শতাধিক ডোঙ্গা বিক্রি হয়েছে। সামনে আরো এক মাস হাট চালু থাকবে। সপ্তাহের সোমবার ও শুক্রবার এখানে হাট বসে।

দুই-তিনজনের পারাপার, মাছ ধরা, ধান কাটা, শাপলা তোলা, শামুক সংগ্রহ, চিংড়ি ও সাদা মাছের ঘেরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় তালের ডোঙ্গা।
নড়াইল-যশোর সড়কের আফরা নদীর পাশে তুলারামপুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি তালের ডোঙ্গা রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। একই জায়গায় কারিগরদের
 
ডোঙ্গায় শেষ আঁচড় দেওয়ার কাজও চলছে। সারি সারি ডোঙ্গায় নানা ধরনের মাথা। মাথাগুলোর নাম মাছের নামে। যেমন শোল মাথা, মজগুর (মাগুর) মাথা, কাইল্লে মাথা প্রভৃতি।

সদর উপজেলার চর শালিখা গ্রামের প্রবীণ কারিগর ফরিদ শেখ (৫৫) কাজ শিখেছেন বাবা প্রয়াত আমির শেখের কাছে। এখন তাঁর ছেলে জাকাত শেখও এই কাজ করেন। এই গ্রামের ১৫টি পরিবারের সদস্যরা ডোঙ্গা তৈরির কাজ করেন। মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেপারীরা ছুটবেন গাছ কিনতে। আগে থেকে কেনা গাছে তৈরি হবে পরের বছরে নৌকা।

তিন প্রজন্মের এই পেশা সম্পর্কে ফরিদ শেখ বলেন, নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর এলাকায় তালগাছ বেশি জন্মে। ফলে এসব এলাকায় তালের ডোঙ্গা তৈরি হতো বেশি। নানা সংকটে দিন দিন সেই কারিগররা হারিয়ে গেছেন। এখন দু-এক জায়গায় তৈরি হয় এই ডোঙ্গা।
ফরিদ শেখ জানান, ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী একটি তালগাছ থেকে দুটি ডোঙ্গা তৈরি করা যায়। একেকটি বিক্রি হয় তিন-চার হাজার টাকায়। আর গাছ কেনা যায় চার-পাঁচ হাজার টাকায়। ভালো একটি ডোঙ্গা ৮-১০ বছর ব্যবহার করা যায়। তবে শুকনো মৌসুমে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। নইলে ফেটে নষ্ট হয়ে যায়।

তুলারামপুর হাটের ইজারাদার তরিকুল ইসলাম (৩৫) জানান, শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ডোঙ্গা বিক্রি হয় বেশি। এরপর কমতে থাকে। এখানে সাতক্ষীরা, যশোর, মাগুরা, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা আসেন। তাঁরা ডোঙ্গা কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যান।